আরমান রশিদ
রাকিব ছিল সেইসব মানুষের একজন, যারা শব্দের আগে নীরবতাকে বিশ্বাস করে। তার জীবন ছিল শান্ত নদীর মতো - উপর থেকে স্থির, ভেতরে ভেতরে ধীর স্রোত। সে উচ্চস্বরে হাসত না, কষ্টের কথা বলত না। বিশ্বাস করত - যা সত্য, তা চুপচাপ থাকলেও টিকে থাকে। তার দিনগুলো ছিল অভ্যাসের মতো সাজানো। সকালের বাসের জানালায় জমে থাকা ধুলো, বিকেলের শেষ আলো, রাতের ঘরের নিস্তব্ধতা - এইসব ছোট ছোট দৃশ্যেই সে নিজেকে চিনত। সে বড় স্বপ্ন দেখত না, শুধু চেয়েছিল - কারও পাশে নির্ভর করে দাঁড়াতে। মিমের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল লাইব্রেরির নীরবতার ভেতর। বইয়ের তাকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দু’জন মানুষ - একজন খুঁজছিল বই, আরেকজন খুঁজছিল আশ্রয়। মিম হেসে বলেছিল, “মনে হয় আজ বইটা আমাদের দু’জনেরই দরকার।” সেই হাসি ছিল হালকা বাতাসের মতো - কিছুক্ষণের জন্য এসে মন ছুঁয়ে গেল। মিম ছিল আলোয় ভরা। কথা বলত সাবলীলভাবে, তার চোখে ছিল দূরের কোনো শহরের ডাক। রাকিব তার পাশে দাঁড়িয়ে নিজেকে আরও ছায়াময় মনে করত। তবু যখন মিম বলেছিল, “তুমি খুব সহজ,” রাকিব সেই সহজের মধ্যেই নিজের ঘর বানিয়ে ফেলেছিল। ভালোবাসা তাদের জীবনে শব্দ করে আসেনি। এসেছে শিশিরের মতো - রাতে পড়ে, ভোরে টের পাওয়া যায়। প্রতিদিনের ছোট বার্তা, ক্লাস শেষে কয়েক মিনিট হাঁটা, পরীক্ষার আগের নীরব শুভকামনা - এইসব সামান্য মুহূর্তই রাকিবের কাছে পূর্ণতা হয়ে উঠেছিল। সে বুঝতেই পারেনি, কবে এই অভ্যাসের নাম ভালোবাসা হয়ে গেছে। পাঁচটা বছর কেটে গিয়েছিল। পাঁচটা বছর মানে শুধু সময় নয় - একটা মানুষ ধীরে ধীরে নিজের অস্তিত্ব অন্যের ভেতর রেখে দেওয়া। রাকিব তার ভবিষ্যৎ ভাবনাগুলো মিমের পাশে বসিয়ে দেখত। সে ভাবত, দু’জন একসাথে থাকলে জীবনটা একটা নিরাপদ ঘরের মতো হবে। কিন্তু সময় একরকম থাকে না। মিম ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছিল - যেন আলোটা একটু একটু করে সরে যাচ্ছে। কথার উষ্ণতা কমে গেল, উত্তরের মাঝে ফাঁক পড়তে লাগল। মিম বলত, “আমি ব্যস্ত,” “আজ মন ভালো নেই।” এই কথাগুলো ছিল বন্ধ দরজার মতো - বন্ধ, কিন্তু চুপচাপ। রাকিব অপেক্ষা করত। অপেক্ষা করতে করতে সে নিজেই একটা ছায়ায় পরিণত হচ্ছিল। ফোনের পর্দা অন্ধকার থাকলে তার বুকের ভেতর ফাঁকা লাগত, ঠিক শুকিয়ে যাওয়া কুয়োর মতো। তবু সে নিজেকেই বোঝাত - সব নদী তো একসময় আবার ভরে। মিমের নীরবতা ছিল শেখা এক শিল্প, আর রাকিবের নীরবতা ছিল ধীরে ধীরে নিজেকে মুছে ফেলা। একদিন দেখা করার সময় রাকিব বুঝেছিল - মিম আর আগের মতো তাকায় না। চোখে চোখ রাখে না। কথার মাঝখানে যেন অদৃশ্য দেয়াল দাঁড়িয়ে গেছে। সে প্রশ্ন করতে চেয়েছিল, কিন্তু ভয় পেয়েছিল - একটা প্রশ্নেই যদি সব ভেঙে যায়? শেষদিনটা এসেছিল খুব শান্তভাবে। কোনো ঝড়, কোনো ভাঙচুর - কিছুই নয়। মিম বলেছিল, “রাকিব, আমার আর ভালো লাগছে না। আমরা হয়তো ভুল ছিলাম।” এই কথাগুলো ছিল শরতের শেষ পাতার মতো - নীরবে ঝরে পড়া। পাঁচটা বছরের স্মৃতি এক মুহূর্তে মাটিতে পড়ে গেল। রাকিব জানতে চেয়েছিল - কোথায় ভুল? কখন? কিন্তু মিম তখন অনেক দূরের মানুষ। সে শুধু বলেছিল, “তুমি ভালো মানুষ। কিন্তু আমার আর থাকা সম্ভব না।” ভালো মানুষ হওয়া যে কখনো কখনো ছায়ার মতো - আলোয় যার অস্তিত্ব ধরা পড়ে না - রাকিব সেদিন বুঝেছিল। মিম চলে যাওয়ার পর রাকিবের জীবন চলছিল, কিন্তু তার ভেতরের আলো নিভে গিয়েছিল। সে অফিসে যেত, কাজ করত, কথা বলত। মানুষ ভাবত, সে ঠিকই আছে। কেউ দেখেনি, তার ভেতরে ধীরে ধীরে শীত নামছে। রাতে স্মৃতিরা আসত। শব্দ না করে। মিমের হাসি, তার বলা কথা, ভবিষ্যৎ নিয়ে আঁকা ছবি - সবকিছু যেন কুয়াশার মতো তাকে ঘিরে ধরত। সে কোনো উত্তর পেত না। ধীরে ধীরে সে নিজেকেই দোষী ভাবতে শুরু করেছিল। মনে হতো, সে যথেষ্ট ছিল না বলেই আলোটা সরে গেছে। সে কাউকে কিছু বলেনি। তার কষ্টের ভাষা ছিল না। অবহেলা যে নীরব বিষ - এটা কেউ বুঝতে পারেনি। একদিন সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকিয়েছিল। সেখানে সে কাউকে চিনতে পারেনি। চোখের নিচে গভীর ছাপ, মুখে ক্লান্তির ছায়া। বিশ্বাস করতে করতে সে নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছে - এই উপলব্ধি তাকে আরও নিঃশব্দ করে দিয়েছিল। শেষদিন সে কাউকে দোষ দেয়নি। কোনো অভিযোগ রাখেনি। শুধু খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। যেন দীর্ঘদিন ভারী বোঝা বয়ে নিয়ে হঠাৎ থেমে দাঁড়িয়েছে। ভালোবাসার নামে পাওয়া অবহেলাগুলো তার ভেতরে জমে পাহাড় হয়ে গিয়েছিল। পরদিন সকালে শহরটা আগের মতোই ছিল। শুধু কোথাও একজন কম ছিল। মিম খবরটা পেয়েছিল অনেক পরে। সে কিছুক্ষণ নীরব ছিল। তারপর বলেছিল, “আমি তো জানতাম না ও এতটা দুর্বল।” কিন্তু রাকিব দুর্বল ছিল না। সে ছিল এমন এক ঘর, যার আলো নিভে গিয়েছিল, কারণ কেউ দরজা খুলে আর ফিরে তাকায়নি। এই গল্পে কোনো চিৎকার নেই। শুধু ধীরে ধীরে নিভে যাওয়া এক প্রদীপ। আর সেই অন্ধকারে থেমে যাওয়া একটি জীবন। এই গল্পটা তাদের জন্য - যারা ভাবে, নীরব মানুষদের কিছু হয় না। আর তাদের জন্য - যারা ভালোবাসাকে অবহেলা করে, কারণ তারা জানে না - নীরবতা সবচেয়ে ভারী শব্দ। কিছু মৃত্যু আলো নিভিয়ে যায়। আর কিছু ভালোবাসা - মানুষটাকেই ছায়া বানিয়ে দেয়।


1 comments:
sad story
Post a Comment