১৯১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জ জেলার কেন্দুয়া অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন জয়নুল আবেদিন। শৈশব থেকেই প্রকৃতি ও নদীর সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর সম্পর্ক। ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী জীবন, জেলেদের সংগ্রাম, কৃষকের শ্রম—এসবই পরবর্তীকালে তাঁর শিল্পের প্রধান উপজীব্য হয়ে ওঠে। কলকাতা গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলে অধ্যয়নকালে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষা লাভ করেন, তবে পাঠ্যশিল্পের সীমার মধ্যেই নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। বরং বাস্তব জীবন, সাধারণ মানুষের দুঃখ-সুখ এবং সামাজিক অসংগতিই হয়ে ওঠে তাঁর প্রকৃত পাঠ্যবই।
বাংলার ইতিহাসে ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ এক ভয়াবহ অধ্যায়। এই দুর্ভিক্ষ জয়নুল আবেদিনের শিল্পীজীবনে এক যুগান্তকারী মোড় নিয়ে আসে। রাস্তায় পড়ে থাকা ক্ষুধার্ত মানুষ, কঙ্কালসার দেহ, শূন্য চোখ—এই বাস্তবতা তাঁকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। তিনি তখন আঁকেন তাঁর বিখ্যাত দুর্ভিক্ষের স্কেচসমূহ (Famine Sketches, 1943)। এসব স্কেচে কোনো অতিরঞ্জন নেই, নেই সৌন্দর্যের বাহুল্য—আছে কেবল নির্মম সত্য। এই কাজই তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিত করে তোলে এবং প্রমাণ করে, শিল্প কেবল সৌন্দর্যের জন্য নয়—শিল্প প্রতিবাদের ভাষাও হতে পারে।
জয়নুল আবেদিন ছিলেন বহুমাত্রিক শিল্পী। তিনি একাধিক মাধ্যম ও কৌশলে কাজ করেছেন:- স্কেচ ও ড্রয়িং, জলরঙ, তেলরঙ, কালি-কলম ও চারকোল, লিনোকাট ও উডকাট (প্রিন্টমেকিং), স্ক্রল পেইন্টিং (দীর্ঘ পটচিত্র)। বিশেষত তাঁর স্ক্রল পেইন্টিং বাংলার লোকশিল্পের ধারাকে আধুনিক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
জয়নুল আবেদিনের শিল্পে গ্রামবাংলা একটি কেন্দ্রীয় বিষয়। কৃষকের লাঙল ধরা হাত, জেলের জাল টানা, নৌকার ছলাৎছল জলে চলা—এসব চিত্রে তিনি শ্রমজীবী মানুষের শক্তি ও মর্যাদা তুলে ধরেছেন। তাঁর আঁকা গ্রামীণ দৃশ্যাবলি কখনো রোমান্টিক নয়; বরং বাস্তব, সংযত এবং গভীর মানবিকতায় ভরপুর।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের উল্লেখযোগ্য ও আলোচিত চিত্রকর্মগুলোর মধ্যে রয়েছে:- দুর্ভিক্ষের স্কেচসমূহ (Famine Sketches, 1943), নবান্ন, মনপুরা ‘৭০, জেলেরা (The Fishermen), লাঙ্গল, মাছ ধরা, কৃষক, ধান কাটা, নৌকাযাত্রা, গ্রামবাংলা সিরিজ, নদী ও চর, মা ও শিশু, সংগ্রাম, বাংলার মুখ। বিশেষভাবে মনপুরা ‘৭০ চিত্রে উপকূলীয় মানুষের দুর্যোগ-পরবর্তী বেদনা ও সংগ্রাম অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
১৯৪৮ সালে তিনি ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করেন ঢাকা আর্ট কলেজ, যা আজকের চারুকলা অনুষদ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)। এই প্রতিষ্ঠান থেকেই গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের বহু খ্যাতিমান শিল্পী। তাঁর নেতৃত্বেই বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পচর্চা একটি সুসংগঠিত রূপ লাভ করে। শিল্প ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি বহু সম্মানে ভূষিত হন। ১৯৭৪ সালে তাঁকে দেওয়া হয় “শিল্পাচার্য” উপাধি—যা আজও তাঁর নামের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
১৯৭৬ সালে তাঁর মৃত্যু হলেও তাঁর শিল্পচিন্তা আজও জীবন্ত। দুর্ভিক্ষের স্কেচ থেকে গ্রামবাংলার চিত্র—সবখানেই তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, শিল্প মানে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। তাঁর কাজ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, একটি জাতির ইতিহাস কেবল বইয়ে নয়—রেখা ও রঙের মধ্যেও লেখা থাকে।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের শিল্প আমাদের জন্য আয়নার মতো—যেখানে আমরা দেখি আমাদের সমাজ, আমাদের সংগ্রাম, আমাদের মানুষ। তিনি প্রমাণ করেছেন, শিল্পীর দায়িত্ব কেবল সৌন্দর্য সৃষ্টি নয়; বরং সময়ের সত্যকে সাহসের সঙ্গে তুলে ধরা। তাই তিনি শুধু একজন শিল্পী নন—তিনি বাংলাদেশের শিল্পচেতনার চিরন্তন অভিভাবক।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন এর শিল্প জীবনী
আরমান রশিদ
বাংলাদেশের শিল্প-ইতিহাসে যে ক’টি নাম উচ্চারিত হলেই একসঙ্গে শিল্প, মানবতা, প্রতিবাদ ও জাতিসত্তার কথা মনে পড়ে—তাদের মধ্যে শীর্ষে অবস্থান করেন জয়নুল আবেদিন। তিনি কেবল একজন চিত্রশিল্পী নন; তিনি একটি জাতির শিল্পচেতনার স্থপতি, আধুনিক শিল্পআন্দোলনের পথপ্রদর্শক এবং মানবিক শিল্পবোধের অনন্য প্রতিনিধি। তাঁর তুলিতে গ্রামবাংলার সহজ জীবন যেমন ধরা পড়েছে, তেমনি উঠে এসেছে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের হাহাকার, নিপীড়িত মানুষের নীরব আর্তনাদ এবং সংগ্রামী জীবনের অবিচল শক্তি।


0 comments:
Post a Comment